সংবাদ শিরোনামঃ

পুলিশ সন্ত্রাসী ভাই ভাই

gdfg copy

সিটিজি ক্রাইম নিউজ ডেস্ক :-  রাজধানীর ভাষানটেকে আছে সন্ত্রাসীদের অন্তত ১২টি দুর্ধর্ষ গ্রুপ। কেউ প্রকাশ্যে তাদের নামও মুখে আনতে সাহস পায় না। তারা এতটাই ভয়াবহ যে, কথায় কথায় গুলি আর খুন করে। চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল ও মাদক ব্যবসা তাদের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু এসব অপরাধ দমনে যাদের প্রধান দায়িত্ব সেই পুলিশও এখানে নির্বিকার। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখানকার থানা পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা তাদের সহায়তা করেন। তাই ক্ষোভের সঙ্গে এলাকার ভুক্তভোগীদের অনেকে বলে থাকেন, ওদের বিরুদ্ধে নালিশ করে কোনো লাভ হবে না। কেননা, এখানে তো ‘পুলিশ সন্ত্রাসী ভাই ভাই’। এ রকম চাপা ক্ষোভ আর অভিযোগের অন্ত নেই ভাষানটেক এলাকার সাধারণ মানুষের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগীদের অনেকে যুগান্তর প্রতিবেদককে জানিয়েছেন এমন সব ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। সালাম গ্রুপের প্রধান সালাম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার ভাই নাটু জামাল চালাচ্ছে একটি গ্রুপ। রূপচাঁদ ও রতন অপর একটি গ্রুপের দায়িত্ব পালন করছে। ইলেকট্রিক মিজান গ্র“পের সদস্য রয়েছে অন্তত সাতজন। আরেকটি গ্রুপের প্রধান বাবলু। সন্ত্রাসী ইব্রাহিম দেশের বাইরে থাকলেও তার সদস্যরা রয়েছে এলাকায়। কিলার আব্বাস কারাবন্দি থাকলেও সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে তার লোকজন। এ ছাড়া হাসান মোল্লার বিরুদ্ধে জমি দখল ও তার ভাই রুবেল মোল্লার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। দাবিকৃত চাঁদার টাকা না পেয়ে ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর ভাষানটেক দেওয়ান পাড়ায় সুনীল কর্মকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সহযোগীদের নিয়ে সশস্ত্র হামলা চালায় রুবেল। সেখানে গিয়ে সুনীলের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সে। টাকা না পেয়ে তাকে ও তার কর্মচারীদের মারধর করে হামলাকারীরা। একপর্যায়ে সুনীলের কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। চলে যাওয়ার সময় এক নারী কর্মচারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে রুবেল। এ ঘটনায় ৩ ডিসেম্বর সুনীল কর্মকার বাদী হয়ে চাঁদাবাজিসহ ধর্ষণচেষ্টার মামলা করেন রুবেল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। কচুক্ষেত এলাকার সন্ত্রাসী আরমান রয়েছে জেলে। তার ফুফা জামাই সামসুর বিরুদ্ধেও রয়েছে চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ। আছে থানায় একাধিক জিডি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েকটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি জমি দখল করে গড়ে তুলেছে বস্তি। বস্তিগুলোতে নেয়া হয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চোরাই সংযোগ। এর ফলে লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে সরকারের। উপরন্তু বস্তির ঘরভাড়া ও অবৈধভাবে সংযোগ দেয়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ খাত থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এলাকার শক্তিশালী চক্র। এই চক্র ভাষানটেক থানা পুলিশের এক কর্মকর্তাকে এসব অপকর্মের কমিশন দেয়। এ ছাড়া সড়কের পাশের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট। এ কাজের নেপথ্য সহযোগীও পুলিশ।
এলাকার ভুক্তভোগীদের অনেকে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, একদিকে বস্তি এলাকা, অপরদিকে পুলিশের ইন্ধন। দুয়ে মিলে পুরো ভাষানটেক যেন অপরাধের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। যে কারণে এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অহরহ ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। বাসাবাড়ির গ্রিল কেটে দুর্ধর্ষ চুরি ও ডাকাতির ঘটনাও কম নয়। গত ৩ ডিসেম্বর পশ্চিম ভাষানটেকের ৬/৫/এ হোল্ডিংয়ে আল আমিন ওরফে বিটুল নামের এক ব্যক্তির বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দস্যুরা। তবে অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। কারণ প্রতিকার হয় না বলে মানুষ জিডি কিংবা মামলা করতে থানায় যান না। এ ছাড়া পুলিশ একেবারে বাধ্য না হলে চুরি ও ডাকাতির মামলা নিতে চায় না। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চুরি ও ডাকাতদলের অন্যতম সদস্য হানিফ, রূপচাঁদ, নবী, চোরা আলী, শওকত ও জাহাঙ্গীর। এদের সবার বসবাস এলাকার বিভিন্ন বস্তিতে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, সিআরপির পেছনে সরকারি জায়গা দখল করে একটি চক্র অবৈধভাবে গড়ে তুলেছে বিশাল বস্তি। সেখানে পাঁচ শতাধিক ঘর তুলে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এই চক্রের অন্যতম জাহাঙ্গীর ওরফে কানা জাহাঙ্গীরের ঘর রয়েছে ২শ’টির ওপরে। মূলত তার নামেই নামকরণ বস্তিটির। আরও যাদের ঘর রয়েছে তাদের মধ্যে পেটকাটা আবুলের ২০-২৫টি, জহির ভাণ্ডারির প্রায় ২৫টি, কবির মহাজনের রয়েছে ৩০টি, ওসমানের ৪০-৪৫টি, টগর আলীর প্রায় ৩০টি, রূপ মিয়ার ১০-১২টি, আজিজুলের ১০-১১টি, আয়ছুদ্দির ১২-১৪টি, শুক্কুরী বেগমের ৫-৬টি, নিজামের ২০-২২টি ও মালেকের রয়েছে ২৮-৩০টি ঘর। এ তালিকায় থাকা এ রকম আরও অনেকের ঘর রয়েছে এই বস্তিতে। বস্তিবাসী জানান, একেকটি ঘরের ভাড়া দেড় হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা। গড়ে ২ হাজার টাকা হিসেবে ৫শ’ ঘর থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা ভাড়া তোলা হয়। এ ছাড়া এই বস্তিতে অবৈধভাবে গ্যাস ও পানির লাইন দিয়েও টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুতের একটি মিটার বৈধভাবে নিয়ে একই মিটার থেকে একাধিক ঘরে বিদ্যুৎ লাইন চালানো হচ্ছে। জানতে চাইলে কানা জাহাঙ্গীর যুগান্তরকে বলেন ‘সরকারের জায়গা পড়ে আছে তাই ঘর করে ভাড়া দিয়েছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেখানে মালেকের ভাই শুক্কুর মাদক বেচে।
টিনশেড নামার বস্তিতে চার হাজারেরও বেশি ঘর রয়েছে। আবুল খায়ের ভুট্টো নামে এক ব্যক্তি সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। তার নিজের রয়েছে প্রায় ৪শ’টি ঘর। জনৈক মোরশেদের ঘর রয়েছে প্রায় ১২০টি, জাভেদের রয়েছে ২শ’টির কিছু কম, আরমানের ৭০-৭৫টি, লিটনের ৯০-৯৫টি, শাহজাহানের প্রায় ২শ’টি, রশিদ জমিদারের তিন শতাধিক, ফারুকের দেড়শ’টি, কামালের অর্ধশত, ইসলামের ৪০-৪৫টি, ফরহাদের প্রায় ৮০টি প্রমুখ। আর এভাবে শত শত ঘর তুলে দিব্যি বাড়িওয়ালা বনে গেছে তারা। মাসে মাসে পকেটে পুরছে লাখ লাখ টাকা।
ভাষানটেক বস্তি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। একেকভাগে নিজেরাই চেয়ারম্যান নিয়োগ করেছে। ওই চেয়ারম্যান বিচার-আচার করে থাকে। আর সব চেয়ারম্যানের গুরু নাগর চেয়ারম্যান। ভাষানটেক বস্তিতে রয়েছে কয়েক হাজার ঘর। এসব বস্তিতে জুয়ার আসরও বসানো হয়। বস্তিজুড়ে রয়েছে মাদকের ছড়াছড়ি। বস্তির বাইরেও রয়েছে মাদকের স্বর্গরাজ্য। পুরান কচুক্ষেত এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা করে কালা বাবুল, বাচ্চু, রুবেল, জলিল ও নাসিরসহ অন্তত ২৫ জন। মাটিকাটা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী রূপচান। পকেটগেট এলাকায় গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে কালু (বর্তমানে জেলে), ধামালকোট এলাকায় অহিদুল, মোস্তফা, সালমা, নাজু ও কাওছার অন্যতম। কাওছার জেলে থাকায় বর্তমানে তার স্ত্রী মাদক বিক্রি করে। ৩ নম্বর মোড়ে গাঁজা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে রিপা ওরফে স্বপ্না। শরিফের রিকশা গ্যারেজের সামনে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয় গাঁজা।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে ভাষানটেক বাজার পর্যন্ত প্রধান সড়কটির চার ভাগের তিন ভাগ দখলদারদের দখলে। প্রভাবশালী দখলদাররা রাস্তার এসব জায়গায় টিন ও কাঠ দিয়ে দোকানপাট করে ভাড়া দিয়েছে। বাজারও বসানো হয়েছে রাস্তার ওপর। যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের প্রত্যেকের রয়েছে একাধিক দোকান। সব মিলিয়ে ওই সড়কে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাত শতাধিক। মাসে লাখ লাখ টাকা তোলা হচ্ছে সেসব দোকান থেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দোকানি জানান, ভাষানটেক থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) এবিএম আসাদুজ্জামান ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ পেয়ে থাকেন। আর মোটা অংকের বাড়তি আয় ধরে রাখতে এই থানায় আছেন দীর্ঘদিন। ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার আগে তিনি এখানে এসআই হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বস্তি নিয়ন্ত্রণকারীদের কাছ থেকেও মাসোয়ারা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) এবিএম আসাদুজ্জামান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি কেন টাকা নিতে যাব। কোথাও থেকে আমি টাকা-পয়সা নেই না।’
সরেজমিন জানা যায়, ১৪ নম্বর ও ভাষানটেক মোড়ে যানবাহন স্ট্যান্ডে প্রতিদিন চলছে চাঁদাবাজি। ভাষানটেক বাজারের স্ট্যান্ডে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও চ্যাম্পিয়ন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করে ইস্টার্ন সোহেল। গাড়ি থেকে টাকা উঠায় মানিক, রিপন ও বাবু। ১৪ নম্বর স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করে জামিল, পিন্টু ও জামাল।
এলাকার বিভিন্ন অপরাধ ও দখল সম্পর্কে জানতে চাইলে ভাষানটেক থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, রাস্তার পাশের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা স্থাপনার মালিকদের বিষয়ে নন-এএফআইআর প্রশিকিউশনের তালিকা করে আদালতে দাখিলের কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে ২০১ জনের তালিকা দাখিল করা হয়েছে। মাদক ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, এলাকায় মাদক অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। বড় মাদক ব্যবসায়ীদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

About Asgor Ali Manik

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*