সংবাদ শিরোনামঃ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পর্ক ও তার করণীয়

লেখক ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ:

ইন্টারনেটের মাধ্যমে আলাপ আজকাল আর নতুন কিছু নয়! টুইটার, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের যুগে বরং ভার্চুয়াল জগতের মানুষরাই আজকাল যেন বেশি আপন। বর্তমান সময়ে ফেসবুককে বিবেচনা করা হচ্ছে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশের উল্লেখযোগ্য একটি জায়গা হিসেবে। এবং সেই সাথে সম্পর্ক তৈরিরও। ফেসবুকের বন্ধুরা হয়ে উঠছেন আপনের চেয়েও আপন!

শুধু কি বন্ধুত্ব? প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার মাধ্যম হিসেবেও ফেসবুক এখন ব্যাপক আলোচিত। ফেসবুক বন্ধুকে ভালো লেগে যাওয়া, কাছাকাছি আসা, অতঃপর প্রেম- এ যেন এখন ফেসবুকের নিত্যকার কাহিনী। একে অপরকে জানা, মানসিকতা বিচার, জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা লাভ- সবকিছুই হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে। তাই এখন ফেসবুক শুধু সংহতি প্রকাশ বা বন্ধুত্বের মাধ্যম হিসেবে নয়, বিবেচিত হচ্ছে রোমান্টিক সম্পর্কের মাধ্যম হিসেবেও!

ফেসবুকের সব দিকই ইতিবাচক? মোটেও না! এখানেও রয়েছে প্রতারিত হবার সম্ভাবনা। এমনকি হতে পারেন হয়রানির শিকারও। ফেসবুকে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানির মতো অসুস্থ্ আচরণের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। হ্যাকিংয়ের মতো সাইবার অপরাধের হার বৃদ্ধি পাবার কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে এই ফেসবুককেই! এতসব নেতিবাচক ব্যাপার থাকা সত্ত্বেও ফেসবুকে মানুষের আনাগোনা বেড়েই চলছে। চলছে বন্ধুত্ব, প্রেম এবং বিয়েও…

বিয়ের কথায় চমকে গেলেন? ফেসবুকের প্রেমের সম্পর্ক এখন গড়াচ্ছে বিয়েতেও! এর অন্যতম উদাহরণ হলেন আমাদের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। তিনি তাঁর স্ত্রীকে খুঁজে পেয়েছেন এই ফেসবুকেই। শিশির সাথে ফেসবুকেই তাঁর পরিচয়, প্রেম। অতঃপর ভার্চুয়াল জগত থেকে এ সম্পর্ক বাস্তব জগতে চলে আসে, অর্থাত্‍ বিয়ে।

ফেসবুক প্রেমে বিয়ের পর-
ভার্চুয়াল জগতের মানুষের সাথে বিয়ে হলে দাম্পত্যে হাজির হতে পারে অদ্ভুত কিছু সমস্যা। যেমন বিয়ের পর হঠাত্‍ খেয়াল করলেন যে, আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে। আপনারা একে অপরের সাথে অনলাইনে যতটা স্বচ্ছন্দ, বাস্তবে ততটা নন। ফলে হতে পারে বোঝাপড়ার অভাব। কথায় কথায় লেগে যেতে পারে ঝগড়া, হতে পারে মন কষাকাষি! আর বেড়ে যেতে পারে দুজনের মধ্যে দূরত্ব।

আমরা ইন্টারনেটের যে সুযোগ-সুবিধাটা পেয়েছি, তা আমাদের অভিভাবকরা পাননি। ফলে এ ধরনের সমস্যায় তাঁদের পড়তেও হয়নি। দাম্পত্যের এই আজব সমস্যার সমাধান তাঁদের কাছে না থাকায় তাঁরাও এগিয়ে আসতে পারেন না। ফলে সমস্যা যেন আরো প্রকট আকার ধারণ করে। দাম্পত্যের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে আপনাদেরকেই!

ফেসবুকের দুনিয়ায় সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও পুরো মানুষটাকে চিনে এবং বুঝে ওঠার জন্য এই মাধ্যমটি যে যথেষ্ট নয়, তা তো বোঝাই যাচ্ছে! ফলে বাস্তব যত কঠোর হোক সেটার সাথে যত দ্রুত মানিয়ে নেয়া যায়, ততই ভালো। কথা কাটাকাটি, ঝগড়াঝাঁটি যাই হোক না কেন, নিজেদের কম্পিউটার স্ক্রিনের আড়ালে রাখবেন না। একে অপরকে এড়িয়ে থাকলে সম্পর্ক কখনোই দৃঢ় হবে না। যদি মতের মিল না হয়, তাহলে সোজাসুজি কথা বলাটা সবচেয়ে ভালো। আসলে, নিজেদের মধ্যে সমস্যা রয়েছে এটা বুঝতে পারাটাই হলো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ।
নিজেদের সম্পর্কের শর্তগুলি নির্দিষ্ট করুন। এ দায়িত্ব দুজনেরই। একজন যদি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন বা মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনচেতা হন, তাহলে তা সম্পর্কে সমস্যার সৃষ্টি করবেই। যখনই মনে হবে সঙ্গীর আচরণ বা ব্যবহারের জন্য আপনার স্বাধীনতায় বাধা আসছে, বুঝবেন, নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে ভালো ভাবে ভাবার সময় চলে এসেছ। তবে জেদের বশে কোনো কাজ করবেন না। এতে শুধু শুধু নিজের সম্মান হারাবেন। স্বাধীনতার সাথে ভারসাম্য রক্ষার জন্য পরিবারে কিছু প্রাথমিক নিয়মকানুন প্রয়োজন। যেমন দিনে অন্তত একবেলা সবাই একসাথে খেতে বসা, নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি ফেরা, একে অন্যের কাজে সাহায্য করা ইত্যাদি। এসব কাজ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ায়। ফলে সম্পর্কের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে।
একসাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। আপনার সঙ্গীকে কাছ থেকে দেখে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করুন। ফেসবুকের ব্যক্তি আর বাস্তবের ব্যক্তির মধ্যে তুলনা করতে যাবেন না। এতে শুধু জটিলতা বাড়বে বই কমবে না!
দীর্ঘ সময় দুজন দূরে থাকলে চেষ্টা করুন যোগাযোগটা অনলাইনে না করে ফোনে করতে। আর অনলাইনে করতে হলে ভিডিও চ্যাট করুন। এতে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ থাকবে না। মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরে দুজনে দেখা করুন। আলাদা পরিবেশে একজন আরেকজনের মধ্য নতুন ব্যাপার আবিষ্কার করতে পারবেন। ফলে নৈকট্য আরো বেড়ে যাবে।
সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকবেই! সেটা প্রেমিক-প্রেমিকার হোক বা স্বামী-স্ত্রীর। ধৈর্য ধরে এগিয়ে যান, সহজে হাল ছেড়ে দেবেন না। তাহলেই দেখবেন সুখী দাম্পত্যজীবনের খোঁজ খুব দ্রুত পেয়ে যাবেন।
ফেসবুকে মনে রাখুন :

কাউকে ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় যোগ করার আগে তাঁর প্রোফাইল দেখে নিন। শুধু মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের সংখ্যা দেখে কাউকে অ্যাড করবেন না।
কাউকে ভালো লেগে গেলে তাঁকে প্রস্তাব দেবার আগে তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর করুন। প্রয়োজনে আপনারদের মিউচুয়াল কোনো বন্ধু, যাঁকে আপনি ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন, এমন দু একজনের সাথে কথা বলুন।
ফেসবুকে কেউ তথ্য গোপন করলে তা বুঝতে পারা খুব কঠিন। তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।
সম্পর্ক যত গভীরই হোক না কেন ফেসবুকে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ কথাবার্তা বলবেন না। যাঁরা প্রতারণার উদ্দ্যেশেই সম্পর্ক করে তাঁরা এসবের স্ক্রিনশট রেখে দেয় এবং পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করে।
কেউ যদি ভালো সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে কোনো কুপ্রস্তাব দেয়, তাহলে স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন। তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চাইলে এটা প্রমাণ হিসেবে কাজে দেবে।
ফেসবুকে প্রেমের ব্যাপারে সতর্ক হোন। প্রেমালাপ ওয়ালে না করে ইনবক্সে করুন। রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করার আগে সম্পর্কের ব্যাপারে নিশ্চিত হোন। ঘনঘন রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করলে তা খারাপ দেখায়।
সম্পর্ক যত ভালোই হোক না কেন আইডির পাসওয়ার্ড কাউকে দেবেন না। এটা স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এতে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হয়।
অপরিচিত কারো সাথে ভিডিও চ্যাট করবেন না। বাজে পরিস্থিতির মুখমুখি হতে পারেন।
হয়রানী বা প্রতারণার শিকার ছেলে বা মেয়ে, যে কেউ হতে পারেন। তাই সতর্ক থাকুন সকলেই।
স্বামী বা স্ত্রীকেও রাখুন আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে। এতে সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকবে।

About Jisan Ali

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*