সংবাদ শিরোনামঃ

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের একজন সফল শিক্ষক এরফান আলীর গল্প

নুর মোহাম্মদ,হরিপুর(ঠাকুরগাঁও)প্রতিনিধিঃ

ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী হরিপুর উপজেলার পল্লী নির্জন এলাকা চড়ভিটা গ্রাম। গ্রামের পশ্চিমে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে বাংলাদেশ-ভারতের ভৌগলিক সীমানা কাঁটাতারের বেড়া দখল করে আছে। সন্ধ্যা হলেই এলাকার মানুষ ঘরের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। নিস্তব্ধ এলাকা রাত হলেই শোনা যায় শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক। ঝি ঝি পোকার শব্দ। সকাল-সন্ধ্যায় নানা প্রজাতির পাখির কিচির মিচির ডাক। উপজেলার এ সীমান্ত এলাকায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা হাতে গনা মাত্র কয়েকজন। এলাকার মানুষ লাঙ্গল চাষ আর খেত খামারে কাজ করা ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না এবং ভবিষৎ নিয়ে তেমন কিছু ভাবতো না । শহর কি জিনিস এখানকার মানুষ অনেকেই জানত না। এমন এক মুহুর্তে স্বপ্ন দেখলেন গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক এরফান আলী। নিজেও নিজের সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন যে তিনি শুধু নিজ গ্রামে নয় আশে-পাশের গ্রাম ও এই এলাকায় শতভাগ মানুষকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলবেন। এরফান আলীর স্বপ্ন গ্রামে আর কেউ নিরক্ষর থাকবেনা। ২০০১ সালের শেষ দিকে ৬৬ শতাংশ জমিতে ৪০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে চরভিটা স্কুলের যাত্রা শুরু করেন এরফান আলী। পরবর্তিতে আরো ১৬ শতক জমি স্কুলের নামে কেনা হয়। চার জন শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত বর্তমানে স্কুলের শিক্ষার্থী ২৫৪ জন।এছাড়াও ১৬২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ৬ জন শিক্ষক দিয়ে শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় চলে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এলাকার যে সব ছাত্র-ছাত্রী হারিকেন, লেম্ব কিংবা বৈদ্যুতিক আলো জ্বালিয়ে বাড়িতে পড়ালেখা করতে পারে না ৷তাদের স্কুলে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সম্পুন্ন র্বিনা বেতনে পড়ানো হয় এই স্কুলে । রাতের পড়া শেষে অভিভাবকের হাতে বাচ্চাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কোন অভিভাবক সময় আসতে না পারলে তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত বিনয়ী অতিথি পরায়ন। অতিথি দেখলে অত্যন্ত মিষ্টিসুরে সালাম বিনিময়। এ্যাসেম্বলীতে নজর কাড়া পরিবেশ। যা শহরের স্কুলগুলোকে হার মানাতে সক্ষম। এছাড়াও এলাকায় শতভাগ মানুষ স্বাক্ষরতা অর্জন করার লক্ষে “ স্বাক্ষর দানে কর্মসূচী’র অংশ হিসেবে সম্পুর্ন নিজস্ব খরচে এরফান আলী মাষ্টার ১২টি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। স্কুলের খেলার মাঠ, পুকুর, পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে এককথায় যেনো এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশে। স্কুলটিতে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক শিশু পার্ক। পুকুরে হাঁস পালন আর মাছ চাষ করা হয়। শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানো হয় এখানে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি ছাড়াও ১০ বছর চুক্তিতে ১২ বিঘা জমি লিজ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সীমানা প্রাচীর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে রাখা হয়েছে। প্রাচীরে লেখা রয়েছে বিখ্যাত মনিষীদের উক্তি, আঁকা রয়েছে জাতীয় ফুল-ফল, গুনিজনদের ছবি, শিশু শিক্ষার্থীদের আর্কষনীয় মিনা রাজু’র বিদ্যালয়ে যাওয়ার টিয়া পাখি সম্বলিত ছবি সহ অনেক চিত্র। স্কুলের নিজস্ব জাদুঘরে দেখা যায়, গরুর গাড়ি, কুলা, মাথল, লাঠি, ঢেঁকি, যাতা, ছাম, মই ইত্যাদি সাজিয়ে রেখেছেন। লাগানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, বসার জন্য কুটির চালা, খেলার জন্য শিশু র্পাক ভাল পরিবেশের জন্য ফুলের বাগান এবং পুকুরে নৌকা রয়েছে। এই জাদুঘর গড়ে তোলার জন্য পরিবারের একজন শিক্ষকের বেতনের টাকা সম্পুর্ন খরচ করা হয়। দেখা যায়, এত কিছুর পরেও নেই শুধু শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ভবন বা পাকা ঘর। বিদ্যালয়টিতে শ্রেনী কক্ষের অভাবে চরমভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়টির অবস্থান ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা সীমান্ত ঘেষা ৩নং বকুয়া ইউনিয়নের চড় ভিটা গ্রামে। গ্রামের নামনুসারে নামকরন করা হয়েছে চড় ভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এক সময়ের খোলা আকাশের নিচে চট বিছিয়ে পড়ানো স্কুল ২০১৭ সালের ১৭ই মার্চ সরকারি করন করা হয়েছে। স্কুলটি সরকারি হওয়ার সময় এরফান আলী মাষ্টার ৪২ মাসের বেতন হিসেবে ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকা পান। তন্মধ্যে আর্তমানবতার সেবায় ৫ লাখ টাকা এবং স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজে ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করেন। শিক্ষার্থীদের কেউ স্কুলে না আসলে তাৎক্ষনিকভাবে অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মোবাইল সীম দিয়ে ল্যান্ড ফোন ব্যবহার করেন তিনি। কেউ অসুস্থ হলে তার ঔষধ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তাৎক্ষনিকভাবে। বিদ্যালয়ের বাহ্যিক পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হলেও জরাজীর্ন ঘরে শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেখে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এরফান আলীর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, এ বিদ্যালয়টি বে-সরকারী ছিলো বর্তমানে সরকারী হয়েছে। আর এ পরিবেশ আমিসহ এলাকার মানুষের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছি। গ্রাম পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়াতে চায় না। তাই আমি নিজ উদ্যোগে সকলের সহযোগিতায় শিক্ষার আধুনিক পরিবেশ নিয়ে ছেলে মেয়েদের প্রাথমিকে সু-শিক্ষা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এমন পরিবেশ করেছি। ভবন করতে হলে অনেক অর্থের দরকার। তেমন অর্থ যোগাড় হলে আমরা চেষ্টা করতাম শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথা চিন্তা করে ভবন করে নেওয়ার। স্কুলে এসে শিশুরা বিনোদন করতে চাইলে শিশুরা ইচ্ছে করলেই আমাদের লোক দিয়ে নৌকাই করে পুকুরের চার পাশ ঘুরে বিনোদন করতে পারে। ২০১৪ সাল থেকে চালাচ্ছেন মিড-ডে মিল। গ্রামের সকল মানুষের নিকট মুষ্টি মুষ্টি চাল আর হাঁস মাছের আবাদ করে বেশিরভাগ অর্থ দেওয়া এই মিড-ডে মিলে। শিক্ষার্থীদের শরীরে পুষ্টিমান ঠিক রাখার জন্য সম্পুর্ন নিজস্ব খরচে মাসে দুই দিন দুধ, কলা, পাউরুটি খাওয়ানো হয়। শীতের সময় গরীব অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য গরম শীতবস্ত্র দিয়ে থাকি। গণপুর্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ মোস্তাফিজার রহমান ফিজার ২০১৫ সালে স্কুলটি পরিদর্শন করেন। স্কুলের কার্যক্রম বাড়াতে জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন। যতদুর সম্ভব অর্থের পাশাপাশি যোগান দিয়েছিলেন সাহস উৎসাহ উদ্দিপনা। ২০১৮ সালের অক্টোবরে রংপুর বিভাগীয় ডিডি মোঃ আঃ ওহাব স্কুল পরিদর্শনে আসেন । এছাড়াও ঠাকুরগাঁওয়ের সফল ২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে চোরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি । এ বিষয়ে উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার এম এস এ রবিউল ইসলাম বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান ও পরিবেশের প্রশংসা করে বলেন, শিক্ষকদের নিজ উদ্যোগে এমন পরিবেশ সম্বনিত বিদ্যালয় আমার উপজেলায় তেমন নেই। আমরা ভবন নির্মানের লক্ষে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অবগত করেছি। কর্তৃপক্ষ ভবন বরাদ্দ দিলেই পড়ালেখায় বিদ্যালয়টির আরো মান বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।

About Jisan Ali

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*