কোরবানির হাট এখনো জমেনি

আবদুল মতিন চৌধুরী (রিপন)ষ্টাপ রিপোর্টার:

কোরবানি ঈদের বাকি আর মাত্র পাঁচদিন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে কোরবানির পশু। তবে হাট-বাজারগুলো এখনো পুরোদমে জমে ওঠেনি। পাড়া-মহল্লা আর মোড়ে মোড়ে অস্থায়ী গোয়ালঘর বানিয়ে যতœ-আত্তি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বেপারিরা। এবার দেশি গরুর সরবরাহ বেশি। প্রাণিসম্পদ বিভাগও দাবি করছে, দেশি গরু দিয়ে এবার কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সীমান্ত পথে গরু আমদানিতে কড়াকড়ি থাকলেও কয়েকদিন ধরে তা শিথিল হয়েছে। সীমান্ত পথে সীমিত আকারে গরু আসা শুরু হয়েছে। এতে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশীয় খামারিরা। তাদের দাবি, কোরবানির আগ মুহূর্তে ভারতীয় গরু দিয়ে বাজার সয়লাভ হয়ে যায়। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় দেশীয় খামারিরা। দেশীয় খামারে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ মতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু লালন-পালন করা হলেও কোরবানির পশু কেনা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন সাধারণ মানুষ। কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে কৃত্রিম উপায়ে (ক্ষতিকারক ওষুধ ও স্টেরয়েড ব্যবহার) গরু মোটাতাজা করে থাকে। এতে অনেক গরু মারা যায়। গত বছর বিভিন্ন বাজারে অনন্তত ২০টি গরু মারা গিয়েছিল। কোরবানির পশু চেনার উপায় ও হালাল পশু জবেহ নিয়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং ইসলামী গবেষক-চিন্তাবিদরা নানা পরামর্শ দিয়েছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বিভিন্ন বাজার ও জনগুরুত্ব সম্পন্ন এলাকায় এই বিষয়ে লিফলেট ও প্রচারণা চালাচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে চলতি বছর কোরবানি পশুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৫৫,৪১৪টি। স্থানীয়ভাবে জোগান রয়েছে পাঁচ লাখ ৮১,৬৩৪ গবাদি পশু। এরমধ্যে গরু রয়েছে তিন লাখ ৯৪,৫০৩টি, মহিষ ৪৩,৯২১টি, ছাগল/ভেড়া রয়েছে এক লাখ ৪২,৮১৯টি অন্যান্য ৩৯১টি। আর ঘাটতি থাকবে ৭৩,৭৮০টি। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক জসিম বলেন, তিন বছর ধরে দেশে গরু পালনের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে নীবর বিপ্লব হয়েছে। চট্টগ্রামের পশু দিয়ে কোরবানির চাহিদা সিংহভাগ পূরণ করা হবে। চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি থাকা পশু কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং তিন পার্বত্য অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা পশু দিয়ে মেটানো হয়। কয়েক বছর আগেও কোরবানির জন্য পাশ্ববর্তী দেশ ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সেই নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসছে। সরকারের প্রচেষ্টায় দেশে গরু লালন-পালনের সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। তারপরও ভারত থেকে বৈধ-অবৈধ পথে দেশে প্রচুর গরু আসে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটছে না। মাসখানেক আগে ভারতীয় সীমান্তে কড়াকড়ি থাকলেও কয়েক দিন থেকে তা শিথিল হয়ে আসছে। সীমিত আকারে গরু আসা শুরু হয়েছে। এতে দেশীয় খামারিরা পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার সারা দেশে কোরবানির জন্য প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ গবাদি পশু (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ) প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর কোরবানি দেওয়া হয়েছে এক কোটি চার লাখ পশু। সেই তুলনায় এবার উদ্বৃত্ত রয়েছে ১২ লাখ পশু। এছাড়াও প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ভারত, মিয়ানমার ও নেপাল থেকে গবাদি পশু আমদানি করা হয়। এতে কোরবানিতে পশুর সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। কোরবানির পশু কেনার সময় সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ কোরবানির হাটে পশু কেনার সময় সতর্কতা, পশু ক্রয়ের পর করণীয়, কোরবানির আগের দিন, কোরবানির দিন ও কোরবানির পরবর্তী বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে। বিভিন্ন বাজার ও জনগুরুত্ব স্থানে লিফলেট ও প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক জসিম বলেন, কোনটি অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা হয়েছে ক্রেতাদের তা বোঝা উচিত। নগরীর ও জেলায় বিভিন্ন ৮২টি মেডিকেল টিম কাজ করবে। তারা হাট-বাজারে ক্রেতাদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেবেনে। কোরবানিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পশু সরবরাহ করা হয়। এসময় গরুর রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গরুর ক্ষেত্রে ক্ষুরারোগের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগ অভয় দিয়ে বলেছেন, এবার দেশীয় গরু দিয়ে কোরবানির চাহিদা মেটানো হবে। দেশি খামারিরা গরু লালন-পালনে অনেক সচেতন। প্রতিটি খামারি রোগ-বালাই থেকে পশুকে রক্ষা করতে নিয়মিত টিকা দেয়। এমনকি ভারত বা অন্য দেশ থেকে ২-৩ মাস আগে গরুকেও টিকা দিয়ে লালন-পালন করেন। তবে কোরবানির কাছাকাছি সময়ে আসা গরুকে টিকা দেওয়ার সময় থাকে না। প্রতিবছর কোরবানি উপলক্ষে অসাধু ব্যবসায়ী ও বেপারি অতি লোভে ক্ষতিকারক ট্যাবলেট, পাম বড়ি ও ইনজেকশন দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণ করে। পশু চিকিৎসকেরা জানান, ক্ষতিকারক স্টেরয়েড ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময়ের পর মারা যায়। এছাড়াও অতিমাত্রায় ব্যবহার করলে দ্রুত মারা যায়। পশু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্টেরয়েড মূলত হাঁপানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ জাতীয় ওষুধ যেমন-ডেক্সামেথাসন বা ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিএকটিন অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার করলে গরুর কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। গরুর শরীরে পানি জমে যায়। পানি বের হতে পারে না। পানি সরাসরি গরুর মাংসে চলে যায়। ফলে গরু মোটা দেখায়। এসব গরুর মাংস খেলে মানুষের ফুসফুস ও যকৃতে পানি জমে, কিডনি দুর্বল হয় ও হৃদপি-ের ক্ষতি হয়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক জসিম দাবি করেন বর্তমানে গরু ক্ষতিকারক ওষুধ ব্যবহারে গরু মোটাতাজাকরণ করা হয় না। ইতিপূর্বে এভাবে মোটাতাজাকরণ করতে গিয়ে গরু মারা গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী লোকসান গুণে দেউলিয়া হয়েছেন। তাই ক্ষতিকারক ট্যাবলেট খাওয়ানো বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যবান্ধর উপায়ে গরু লালন-পালনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। সরকারও এই বিষয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে দুটি পদ্ধতিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্রয় পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন স্বাস্থ্যবান্ধব। ইউরিয়া সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম, খড় তিন কেজি, চিড়া গুড় আধা কেজি ও ৩-৪ কেজি পানি মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। এছাড়াও ইউরিয়া ব্যবহার না করলে এক শতাংশ করে আঁশ ও দানাদার পদ্ধতিতেও হৃষ্টপুষ্ট করা হয়। ডালের ভূষি, চালের কুড়া, গমের ভূষি, সয়াবিল মিল, তিলে-সরিয়ার কৈল খাওয়ানো হয়।

About Jisan Ali

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*