সংবাদ শিরোনামঃ

চালের বাজার নিয়ন্ত্রনে ব্যবস্থা নিন

 

 

কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ, আর বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। উভয়দিক বিবেচনায় ধান ও চাল কৃষক ও ক্রেতা তথা সাধারণ জনগণের জন্য ন্যায্য ও সহনীয় মূল্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে বরাবরই এর উল্টোটা ঘটে থাকে। সারা বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান কৃষক, কিন্তু কোনো মৌসুমেই তারা ধানের ন্যায্যমূল্য পান না। আবার দেশের ভোক্তাসাধারণ সহনীয় মূল্যে চাল কিনতে পারেন না। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে এর পেছনে কারসাজির জন্য দায়ী দেশের কতিপয় ধান ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের অসৎ একটি চক্র। সম্প্রতি দেশে কয়েক দফায় চালের দাম বেড়ে যাওয়ায়, বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে। গত শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের বাংলাদেশের অর্থনীতির ত্রৈমাসিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত কয়েক মাসে ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ গরিব হয়ে গেছে। আগে তাঁরা দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল, এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। বন্যার পাশাপাশি সময়মতো আমদানি না হওয়ার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে গত কয়েক মাসে হঠাৎ করে চালের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি করার পরও চালের দাম বেড়েছে। এটা বেশ উদ্বেগজনক। সানেম বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। এতে সামনের দিনগুলোতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকার চাল আমদানি করা হয়েছে। গতবার একই সময়ে মাত্র ৩৫ কোটি টাকার চাল আমদানি করা হয়েছিল। তবু প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪২ টাকা থাকলেও এখন তা ৪৫ থেকে ৪৬ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সরু চালও কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে মানভেদে ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৬ টাকায়। সরকারের বিপনন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) দাম বাড়ার এ তথ্য তুলে ধরেছে। তবে ধানের দাম বাড়লেও এ বাড়তি দর যাচ্ছে না কৃষকের পকেটে। কারণ, এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে পরে তা মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মধ্য ফেব্রয়ারি পর্যন্ত সরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টন। এর মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয়েছে ২১ লাখ ৪৫ হাজার টন যার সিংহভাগই এসেছে ভারত থেকে। এ চালের বড় অংশই ব্যবসায়ীরা এনেছেন দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। আমদানির এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৩০/৩৫ ডলার অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে। চাল আমদানিকারকরা জানান, এক সপ্তাহ আগেও ভারত থেকে মানভেদে প্রতি টন স্বর্ণ চাল আমদানি হতো ৪২৫-৪৩৫ ডলারে। একই চাল আমদানিতে এখন ব্যয় হচ্ছে ৪৫০-৪৫৫ ডলার। একইভাবে রত্না জাতের চালেও টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০ ডলার বেশি খরচ হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে স্থলবন্দরটি দিয়ে প্রতি টন ভারতীয় রত্না চাল ৪৪০-৪৫০ ডলার মূল্যে আমদানি হলেও এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ৪৭০ ডলার। বাড়তি দামে আমদানি করা প্রতি কেজি স্বর্ণা চাল ৩৮ থেকে সাড়ে ৩৮ টাকায় বিক্রি করছেন আমদানিকারকরা। একই চাল এক সপ্তাহ আগে তারা বিক্রি করেছিলেন কেজিপ্রতি সাড়ে ৩৬-৩৭ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি রত্না চাল ৩৯ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪২ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও প্রতি বস্ত্মা (৫০ কেজি) ভারতীয় বেতি চাল বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। একই চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। মিয়ানমার থেকে আমদানি করা একই পরিমাণ চাল ১ হাজার ৫৫০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকৃত চালের পাশাপাশি দেশি চালের দাম বাড়ার কথাও তারা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, খাতুনগঞ্জে ৫০ কেজির প্রতি বস্ত্মা মিনিকেট চাল ২ হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এছাড়া প্রতি বস্ত্মা পাইজাম ২ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব চালের দাম খুচরা পর্যায়ে আরেক দফা বেড়ে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চাল বাবদ ভোক্তাদের অতিরিক্ত আড়াই থেকে তিন টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। এদিকে দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ এবং বিভিন্ন দেশ থেকে যথেষ্ট চাল আমদানির পরও ফের এ বাজারে উত্তাপ বাড়ার জন্য কেউ কেউ সরকারের দুর্বল নজরদারি ও অপরিপক্ব পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন। চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতি নিঃসন্দেহে একটি ধাক্কা। যা মোকাবেলায় সরকারকে অবশ্যই সহায়ক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। যেহেতু গতানুগতিক উপায় বাজারব্যবস্থা উত্তরণে তেমন ফলপ্রসূ হতে পারছে না, বিধায়, উদ্যোগী মনোভাব নিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতির কথা ভেবে দেখা সমীচীন। যারা সরকারের সব সাফল্য ম্লান করে দিতেও তৎপর, এদের ছাড় দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। দেশ এবং দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, অসহায় মানুষকে জিম্মি করে, যারা নিজেদের পকেট ভারী করার হীন চেষ্টায় লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কি কিছুই করার নেই? চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পণ্য। এটি নিয়ে হেলাফেলার অবকাশ নেই। খাদ্যে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশে চালের দাম দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত হতাশাজনক। এতে সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি হওয়াও অমূলক নয়। ফলে বাজারে কীভাবে চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে আনা যায়, সেদিকেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি দিতে হবে। বাজারব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা একটি চ্যালেঞ্জ হলেও, তা দক্ষভাবে মোকাবিলার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না।

শামীম শিকদার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর

About Asgor Ali Manik

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*