সংবাদ শিরোনামঃ

আশুলিয়ার সেনওয়ালিয়া ডাকঘর যেন ভূতের বাড়ি…. ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

 
ঢাকা ইন্টারনেট ই-মেইলের এ যুগে হাতে লেখা চিঠির প্রচলন নেই বললেই চলে। পত্র-মিতালির মতো মধুর বিষয়টি এখন অতীত দিনের স্মৃতি। এমন একটা সময় ছিল যখন পত্রমিতালির মাধ্যমে সমমনা মানুষ কিংবা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সম্পর্কের ভিত রচিত হতো। চিঠির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতো নানা রকম সামাজিক সম্পর্ক। চিঠির মাধ্যমে অনুভব করা যেত মানুষের হৃদয়ের উত্তাপ, প্রীতি, ভালোবাসা, অনুরাগ কিংবা বিরাগের বিষয়টি। পত্রসাহিত্য আমাদের বাংলা সাহিত্যে একটি মর্যাদার স্থান নিয়ে আজও অম্লান। সে কারণেই বিভিন্ন মহল এক সুরে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, চিঠি আদান প্রদানের ব্যবস্থাটা যেন ডাক বিভাগ থেকে উঠে না যায়। হোক, ই-মেইল-ইন্টারনেটের যুগ, তবু চিঠি থাক। কিন্তু চাইলেই তো আর চিঠি থাকুক কিংবা ডাকঘর উঠে না যাক- এমন ইচ্ছার প্রতিফলন হবে না। এটার জন্য ডাক বিভাগের থেকেও ন্যুণতম সেবাটুকু জনগনকে পেতে হবে। সেই সেবা কী ডাক বিভাগ আদৌ দিতে পারছে? চলুন ঘুরে আসি পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এ দেশের ডাক বিভাগের বর্তমান ‘স্ট্যাটাস কেমন সেদিকটাতেঃ- ডাক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট পোস্ট অফিসের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৬টি। সব মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ১৭ হাজার। আর ভাতাপ্রাপ্ত লোকবলের সংখ্যা ২৪ হাজারের বেশি। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কারের জন্য বড় ধরনের বরাদ্দ না হওয়ার কারণে বর্তমানে বেশিরভাগ ডাকঘরের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পোস্ট অফিস দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটা অফিস না ভূতের বাড়ি। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও জনবলের অভাবে ভাঙা চেয়ার, টেবিল, কাঠের বাক্স আর খোলামেলা আলমিরায় কোনোমতে চলছে ডাকঘরের কার্যক্রম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি আসবাবপত্রের বরাদ্দ হলেও তা উপজেলা ও শাখা পর্যায়ের ডাকঘরগুলোতে এসে পৌঁছায় না। ফলে আসবাবপত্রের অভাব দীর্ঘদিন লেগে থাকে। প্রয়োজনীয় আলমিরা না থাকায় অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ফেলে রাখা হচ্ছে অরক্ষিত অবস্থায়। সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানাধীন সেনওয়ালিয়া ডাকঘরটি এমনই একটি ‘ভুতের বাড়ি!’ এই প্রতিবেদক সরেজমিন ঘুরে এসে এর সত্যতা এমনই পেয়েছেন। একই সাথে কিছু নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার মতো বিষয়ও সামনে চলে এসেছে। এই ডাকঘরটি বলতে গেলে প্রতিদিনই বন্ধ থাকে (লাগাতার গত তিনদিন গিয়েও ডাকঘর খোলা পাওয়া যায়নি)। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে একটি ডাকঘর থাকলেও, অবস্থানগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথের এলাকাগুলির জন্য একমাত্র ডাকঘর হিসেবে রয়েছে এই সেনওয়ালিয়া ডাকঘরটি। গোকুলনগর, সেনওয়ালিয়া, পানধোয়া, আমবাগান, ইসলামনগর – এই এলাকগুলির মানুষকে এই ডাকঘরের উপর নির্ভর করতে হয়। আর এই নির্ভরতার জন্য এলাকাবাসীকে দিনের পর দিন মাশুল দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি দফতরে কিছু কিছু চিঠি আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাকঘরের দ্বারস্থ হতে হয়। আর এই নির্ভরশীলতায় বিড়ম্বিত হতে হয় ভোক্তা সাধারণকে। সময়মত চিঠি না পাওয়া, একদম শেষ মুহুর্তে পাওয়া আবার কখনো কখনো প্রাপ্তি ঘটে যখন, তখন চিঠির প্রয়োজনীয়ীতা আর থাকে না। একজন ভুক্তভোগীর সাথে এ ব্যাপারে কথা হয়। তিনি জানান যে তাঁর একটি ইন্টারভিউ কার্ড আসার কথা ছিলো, সেটি যেদিন এলো, ইতোমধ্যে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেছে! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই এলাকাবাসী নিজের ক্ষোভ এভাবে জানান, ‘একটি সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সাথে এমন প্রতারণামূলক কাজ করলে সেই প্রতিষ্ঠানের আর দরকার কিসের?’ যারা তথ্য অধিকার নিয়ে কাজ করেন তাদের ভোগান্তি এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী। হাতে সময় নিয়ে চিঠি পাঠালেও সেই চিঠি নির্দিষ্ট সময়ে প্রাপকের নিকটে যায় না; আবার প্রাপ্তি স্বীকার পত্রটিও প্রেরকের হাতে আসে না। ফলে ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। এই প্রতিবেদক নবীনগর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের ডাকঘরের কর্মকর্তার সাথে এই ব্যাপারে আলাপ করলেও তিনি এই ভোগান্তির ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো কারণ তুলে ধরতে পারেন নাই। তবে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব, অপ্রতূল সরকারি ভাতা প্রাপ্তি ইত্যকার কিছু বিষয় সামনে চলে আসে। সেনওয়ালিয়া ডাকঘরের পোষ্ট ম্যান আইয়ুব আলীর কথাই ধরা যাক। সরকার এই লোককে মাসে মাত্র দুই হাজার টাকা সম্মানী ভাতা দেন! আর কিছু কী বলার অপেক্ষা রাখে? এই টাকায় কারও কি-ই বা হয়? প্রতিবেদক আজ আইয়ুব আলীর সাথে কথা বলার জন্য তাঁর খোঁজে সেনওয়ালিয়া ডাকঘরে যান। বলাবাহুল্য, যথারীতি ডাকঘর বন্ধ পাওয়া গেছে এবং ডাকঘর সংলগ্ন বাড়ির কেউওই আইয়ুব আলীর কোনো হদিস দিতে পারলেন না। এমনকি আইয়ুব আলীর নামটিও তারা শুনেন নাই এমনটি জানালেন। এভাবেই একসময় কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে আমাদের ‘ডাকঘর’। পরবর্তী জেনারেশনকে হয়তো ডাকঘরের ছবি দেখিয়ে কখনো বলতে হতে পারে, ‘ এই যে দেখো! এটার নাম ডাকঘর। একসময় এখান থেকে চিঠি আদান-প্রদান করা হতো।’ এছাড়া প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা লোকসানে দিশেহারা ডাক বিভাগ। সর্বশেষ গত পাঁচ বছরে ডাক বিভাগকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একসময়ের জনগণের জনপ্রিয় যোগাযোগের মাধ্যমটি এখন অনেকটাই সরকারের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিঠির লেনদেন নেই বললেই চলে। যারা চিঠি লেনদেন করেন, ডাক বিভাগের আওতা থেকে প্রায়ই তা হারিয়ে যায়। ফলে ডাক বিভাগের বদলে জনগণের আস্থার জায়গাটি নিয়েছে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। তথ্যমতে ২০০২-০৩ অর্থবছর থেকে বাৎসরিক লোকসানের ধকল বেশি মাত্রায় শুরু হয় ডাক বিভাগে। ওই বছর লোকসান ছিল ৮৭ কোটি ৯ লাখ। ২০০৩-০৪ অর্থবছরই লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ২২৯ কোটি টাকা আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ক্ষতি হয়েছে ২৩৪ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাক বিভাগের দিকে সরকারি নজরদারি না বাড়ালে সামনে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে। “হাতে লেখা চিঠি আসেনা আর খাকী রঙের ডাকপিয়ন কে দেখা যায় না মেঠো পথ কিংবা ব্যস্ত শহরের অলি গলিতে, ডাকঘরে খালি বাক্সো মরচে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ডাকবাক্সো ভালবাসা কিংবা প্রতিবেদন সুখবর কিংবা আবেদন কোনো চিঠিই আসে না আগের মত!!!

About Asgor Ali Manik

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*