সংবাদ শিরোনামঃ

কক্সবাজার-১:মনোনয়ন নিয়ে শাসক দলে গ্রুপিং তুঙ্গে, সালাহউদ্দিনের সিদ্ধান্তেই বিএনপি’র প্রার্থী….

এম জাহেদ চৌধুরী||আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারের সবত্র আগাম নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দেশের সর্ব দক্ষিন পুর্বাঞ্চলের এ জেলার প্রবেশদারের প্রথম আসন কক্সবাজার-১(চকরিয়া-পেকুয়া) ।

এ আসনে বিএনপি কৌশলী পদ অবলম্বন করলেও আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী কর্মীদের নিজ নিজ বলয়ে আনতে মাঠে-ময়দানে চষে বেড়াচ্ছেন। সভা সমাবেশ থেকে শুরু করে নানা আয়োজনে ব্যস্থ জাতীয় পার্টিও। মহাজোট থেকে আসন ভাগাতে তৎপর জাপা আর জেপি। তবে চুপ রয়েছে জামায়াতে ইসলামসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো।

কক্সবাজারের রাজনীতির মোড়ল এলাকা হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর চকরিয়া। ২০০২ সালে তৎকালিক চারদলীয় জোট সরকার চকরিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন উপজেলা পেকুয়া প্রতিষ্ঠিত করে। দুটি উপজেলা চকরিয়া-পেকুয়া নিয়েই কক্সবাজার-১ সংসদীয় আসন গঠিত।

এই দুটি উপজেলায় ৮ লাখ মানুষের বসবাস। এই আসনে মোট ভোটর ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৭৬জন। তার মধ্যে চকরিয়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৫৩জন ও পেকুয়ায় ১ লাখ ৪ হাজার ২২৩ জন।

এ আসনে সংসদ সদস্য প্রাথীদের জয়-পরাজয় নির্ভর করে চকরিয়ার ভোটের উপর। কক্সবাজার জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে চকরিয়া পেকুয়ার নেতারাই নেতৃত্বে এগিয়ে থাকায় রাজনৈতিক মোড়ল এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে জেলাবাসীর কাছে। যেমন এ এলাকার বাসিন্দা প্রয়াত এসকে শামসুল হুদা, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম,এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম, মোহাম্মদুল করিম চৌধুরী, সালাহউদ্দিন মাহামুদ, সালাহ উদ্দিন আহমদ, হাজি আবু মোহাম্মদ বশিরুল আলম, আনোয়ার হোসেন কন্ট্রাকটর, সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি, সালাহউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ হোছাইন, নুরুল আবচার, কামাল হোসেন, এ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন, আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইলিয়াছসহ অনেকে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও রয়েছেন।

স্বাধীনতার পূর্বে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার কোন না কোন থানার সাথে চকরিয়াকে একিভুত করে সংসদ নির্বাচন হলেও স্বাধীনতার পর থেকে বৃহত্তর চকরিয়ায়কে কক্সবাজার-১ আসন নির্ধারণ করা হয়। ২০০২ সালে থেকে চকরিয়া-পেকুয়া নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে নির্বাচন হয়ে আসছে।

স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হওয়ার পূর্বে ১৯৭০ সালে অনুষ্টিত নির্বাচনে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হন এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে নৌকা প্রতিক নিয়ে ডাক্তার সামশুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কক্সবাজার-১ আসনে দীর্ঘ ৪৪ বছরে ৯টি জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের কোন প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি। জামায়াতে ইসলামী একবার,জাতীয় পার্টি ৩ বার ও অপর ৫ টি নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়।

বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পেকুয়ার সালাহউদ্দিন আহমেদ তার সহকারী একান্ত সচিব এবং পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় চকরিয়া-পেকুয়া বিএনপির ঘাটিতে রুপ পায়। তারই প্রেক্ষিতে আইনগত জটিলতার কারণে সালাহউদ্দিন আহমদ নির্বাচন করতে না পারায় তার সহধর্মীনি হাসিনা আহমেদ ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করে জয়ী হন।

তত্তাবধায়ক সরকারের সময় থেকে চকরিয়া-পেকুয়ায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা মাঝেমধ্যে দলীয় সভা-সামবেশ করলেও নির্বাচন কেন্দ্রীক কোন কার্যক্রম নিয়ে এখনো মাঠে নামেননি। তবে, বিএনপির একাধিক সুত্রের মতে বর্তমানে ভারতের শিলং এ অবস্থানরত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনগত কোন জটিলতার কারণে আবারো নির্বাচন করতে না পারলে তার স্ত্রী ফের বিএনপির প্রার্থী হতে পারেন ।

কক্সবাজার জেলা বিএনপি’র সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ যাকেই প্রার্থী চাইবেন তিনিই এ আসনে নির্বাচন করবেন। কর্মীরাও তার নির্দেশনায় চলবে। বর্তমান সরকার আমাদের সভা সমাবেশ করতে না দিলেও সাধারন ভোটাররা আমাদের পক্ষে রয়েছে। এসব সাধারন ভোটাররাই বিএনপি’র শক্তি।

১৯৯১ সালে কক্সবাজার-১ আসনে জামায়াতে ইসলামের অধ্যাপক এনামুল হক মঞ্জু দাঁড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তারা জোটে অন্তর্ভুক্ত হলে মনোনয়ন না পাওয়ায় আর কোন নির্বাচনে অংশ নেননি।
জামায়াতে ইসলামের দাঁড়িপাল্লা প্রতিক নিষিদ্ধ হওয়ার পরও এই দলটির নেতা-কর্মীরা থেমে থাকেনি। তারা পাড়া-গাঁয়ে কর্মী সংগ্রহসহ দলীয় কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে চুপিসারে। বিশেষ করে নারীদের জামায়াতে টানতে অত্যাধিক সক্রিয় রয়েছে দলটি। জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সুত্র মতে, দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে না পারলে সতন্ত্র প্রার্থী হবেন যেকোন একজন। তবে, এর আগে ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতের মনোনিত ব্যক্তিকে প্রার্থী করতে চেষ্টাও করা হবে বলেও জানান,জামায়াতের চকরিয়া দক্ষিনের সেক্রেটারী মোজাম্মেল হক।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইলিয়াছ গত সংসদ নির্বাচনে মহজোটের প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিজয়ী হন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চকরিয়া-পেকুয়ায় নিরব জাপাকে সরব করতে বিভিন্ন ইউনিয়নে কমিটি গঠন ছাড়াও কর্মী বাড়াতে কাজ করছেন। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে ফের আওয়ামীলীগ মহাজোট ভিত্তিক প্রার্থী দেবে। সেক্ষেত্রে মো.ইলিয়াছ ফের মনোনয়ন পেতে পারেন বলে জাতীয় পার্টির নেতাদের অভিমত। তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ঘোষনা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দল জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য সালাহউদ্দিন মাহামুদ নিজেও মহাজোট থেকে প্রার্থী হতে যোগাযোগ রাখছেন বলে একাধিক সুত্র জানায়। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান, দুবার সংসদ সদস্য ছাড়াও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭৫ সালের পূর্বে চকরিয়া আওয়ামীলীগের ঘাটি থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব-পরিবারে হত্যার পর আওয়ামীলীগে ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি এখানে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭৩ সালে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্বেও নৌকা প্রতিকের প্রার্থী বিজয়ী হন। স্বাধীনতার পর অনুষ্টিত ১০টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে ওই একবার ছাড়া আর নৌকা প্রতিকে কোন প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলতি বছরের শেষদিকে অনুষ্টিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ার আগে থেকেই চকরিয়া-পেকুয়া আসন থেকে নৌকা প্রতিকের প্রার্থীতা পেতে একাধিক নেতা মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন। আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম প্রচারে এসেছে তারা হলেন- কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি, চকরিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জাফর আলম,জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, জেলা আওয়ামীলীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক ড.মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম সজিব ও জেলা আওয়ামীলীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ মিথুন।

নির্বাচন কেন্দ্রীক প্রার্থীতা পাওয়া নিয়ে চকরিয়া-পেকুয়ায় আওয়ামীলীগের গ্রুপিং এখন তুঙ্গে। চকরিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি জাফর আলম নিজে ও তাকে ঘিরে মাঠে-ময়দানে প্রতিদিন চষে বেড়াচ্ছেনদু’উপজেলার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এমন কোন দিন নেই কোন না কোন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মীসভা করছেননা জাফর আলম। ফলে, তৃণমুল পর্যায়ে তার গ্রহণ যোগ্যতা বেড়ে গেছে অত্যধিক। পাশাপাশি মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি।

দলীয় সুত্র মতে, মানবতা বিরোধী অপরাধীদের সাজা প্রদানকালে চকরিয়ায় জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন ঠেকাতে কর্মীদের নিয়ে মাঠে তৎপর ছিলেন জাফর আলম। পাশাপাশি গত সংসদ নির্বাচনে তাকে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন দিলেও পরে মহাজোটগত কারণে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন জাফর আলম। এই দুটি কারণে কেন্দ্রে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলে একাধিক নেতার অভিমত। প্রতিদিন তৃণমুল নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাফর আলম নৌকার সমর্থন বাড়াতে তৎপর হলেও কতিপয় নেতা জাফর আলমকে ঠেকাতে নানা কৌশলে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে বলে উপজেলা ও পৌর আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতে জাফর নয় আওয়ামীলীগ তথা নৌকা প্রার্থি ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি।

আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্যান্য নেতারা একসাথেই সভা-সমাবেশ করছেন। তাদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি নৌকা প্রতিক নিয়ে তিনবার নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি। তিনি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

আওয়ামীলীগের প্রায় সকল নেতার অভিন্ন অভিমত যাকেই নৌকা প্রতিক দিয়ে মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন দু’উপজেলার দলের সকল স্তরের নেতা-কর্মীদের সরব-নিরব গ্রুপিং পরিহার করে এককাট্টা হয়ে নির্বাচন করলে এই আসনটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান বলেন, এখন অনেকে মাঠে কাজ করছে। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সবাইকে কাজ করতে হবে।

দীর্ঘদিন নিরব থাকা বিএনপি হঠাৎ সরব হয়ে উঠেছিল খালেদা জিয়ার আগমনকে ঘিরে। রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়ার পথে চকরিয়ায় মহাসড়ক জুড়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে তাদের নেত্রীকে স্বাগত জানাতে গিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বাচনী শো-ডাউন করেন।

পরে,আওয়ামীলীগও পাল্টা শো-ডাউন করে দলীয় সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবাইদুল কাদেরের উপস্থিতিতে হারবাংয়ের ইনানী ও চকরিয়া পৌরশহরের বাসটার্মিনালে পৃথক দুটি সমাবেশ করেন।

মহাজোটের দুই শরিক জাপা ও জেপি মহাজোট থেকে এ আসনটি ভাগিয়ে নিতে কেন্দ্রে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। এ আসনের ভোটারদের মাঝে ও শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্বাচনের আলোচনা।

About Asgor Ali Manik

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*