সংবাদ শিরোনামঃ

রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে ব্যবসা করছে একটি দালাল চক্র

আজগর অালী মানিক:
নাফনদের মাঝে দালালদের টাকা ও স্বর্ণালংকার দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। এরপর কক্সবাজার শহরের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিতে উখিয়া-টেকনাফ থেকে চলে আসছে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা। গত সোমবার থেকে উখিয়া-টেকনাফের নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত রোহিঙ্গারা শিবির ছেড়ে হঠাৎ শহরের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্রোতের মতো আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। এতে নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়রাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গার ঢল নামে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সীমান্ত এলাকায়। চাপ বেড়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গারা দালাল অথবা আগে থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে বসবাস করা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকা ছেড়ে কক্সবাজার শহরসহ পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি চট্টগ্রামের দিকেও চলে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। গত সোমবার থেকে শহরের পাহাড়তলী, বৈদ্যেরঘোনা, ঘোনারপাড়া, খাজা মঞ্জিল, লাইটহাউজ, রুমালিয়ারছড়া, সাহিত্যিকাপল্লী, বিজিবি ক্যাম্প এলাকা, কলাতলী আদর্শগ্রাম, সমিতিপাড়া, চন্দ্রিমা সমিতি এলাকা, নতুন জেলগেট এলাকাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ¯্রােতের মতো ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা। তারা এসব রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকায় আগে থেকে পালিয়ে আসা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ও ভাড়া বাসা নিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। প্রতিদিন হাজারো রোহিঙ্গা শহরে ঢুকে পড়ায় আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার পৌর শহরের পাহাড়তলী জিয়ানগর এলাকায় গিয়ে দেখা মিলে নতুন পালিয়ে আসা শতাধিক রোহিঙ্গার। সেখানে কয়েকটি বাড়িতে রোহিঙ্গাদের প্রচ- ভিড় দেখা যায়। হৈচৈ শুরু হয়েছে বাড়িগুলোতে। নারী-পুরুষেরা বাড়িতে বসে আছে। শিশুরা পাহাড়ের ঢালুতে দিকবিদিক ছুটাছুটি করছে। পাহাড়তলী জিয়ানগরে পাহাড় কেটে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করেন দীল মোহাম্মদ (৪২)। তিনিও রোহিঙ্গা। পাঁচ বছর আগে তিনি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে পরিবার নিয়ে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে নারী-পুরুষ, শিশুসহ ২০ রোহিঙ্গা। তারা সবাই তাঁর ও স্ত্রীর আত্মীয় স্বজন। ওই বাড়িতে স্ত্রী সন্তান ও নাতি নাতনি নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মো. হোছন (৫৫)। তাঁর বাড়ি মিয়ানমারের মংডু ধাওনখালী গ্রামে।
তিনি বলেন, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমার মিলিটারি হঠাৎ গ্রামে এসে নির্বিচারে গুলি চালায়। গত ২৮ আগস্ট ফের মিলিটারিরা এসে তাঁর ভাইয়ের ছেলে ওসমান গণি (২৬) ও ওমর ফারুককে (২৩) বাড়ির উঠোনে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তারা সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে পাহাড়ি পথ দিয়ে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে এসে অবস্থান নেন। গত সোমবার নৌকা নিয়ে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এলাকায় চলে আসেন। আসার সময় ওই মাছ ধরার নৌকার মাঝি তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করে। তাদের হাতে টাকা না থাকায় স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে ভাড়া পরিশোধ করেন। পরে হ্নীলার লেদা ক্যাম্পে একদিন থাকার পর গত বুধবার সেখান থেকে তাঁর স্ত্রীর বোনের স্বামী দিল মোহাম্মদ তাদেরকে কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী জিয়ানগর নিয়ে আসেন।
তিনি আরও বলেন, দিল মোহাম্মদ কয়েকবছর আগে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিল। তাঁরা পুরুষ রয়েছে চারজন। বাকিরা শিশু ও নারী। কয়েকদিন পর শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবে। দিল মোহাম্মদের পাশেই ভাড়া বাসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
দিল মোহাম্মদ জানান, অসহায় হিসাবে তাদেরকে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের জন্য থাকা ও কাজের ব্যবস্থা করছেন তিনি। তিনি আরও জানান, জিয়ানগর এলাকা তাঁর বাড়ি ছাড়াও বোরহান, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রব, জসিম উদ্দিন, আবু জমিরসহ প্রায় ১১টি বাড়িতে প্রায় ২শ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এসব বাড়ির মালিকেরাও বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে জিয়ানগরে বসবাস করছেন।
জিয়াবুল হক বলেন, পাঁচদিন আগে তাঁরা একই পরিবারের ১৭ জন টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেন। নাফনদের মিয়ানমার সীমান্তে তাঁরা জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা দিয়ে নৌকায় উঠেন। নদের মাঝখানে টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। প্রতিটি নৌকায় টাকা নেয়ার জন্য মাঝিসহ তিনজন অবস্থান করে বলে তিনি জানান।
পাহাড়তলীর জিয়ানগরে আশ্রয় নেয়া নুর বাহার (৪৫) বলেন, বোটে করে বাংলাদেশে ঢুকার জন্য টাকা ছিল না। নিজের অল্প স্বর্ণলংকার দিয়ে শাহপরীরদ্বীপ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি।
জিয়ানগরে আব্দুর রবের বাড়িতে ৬ সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন জাহেদা বেগম (৩৯)। তাঁর স্বামী কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছেন। মিয়ানমারে তাদের বাড়ি মংডু মেরুল্লা পশ্চিম পাড়া গ্রামে। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার নৌকা ভাড়া দিয়ে টেকনাফের শাপলাপুর এলাকায় উঠেন। এরপর তাঁর স্বামী কয়েকজন লোকের সাথে কুতুপালং শিবিরে চলে যান। আর অন্যান্য নারীদের সাথে তিনি গত বুধবার শহরের পাহাড়তলী জিয়ানগরে এসে আব্দুর রবের ভাড়া বাসায় উঠেন। পাহাড়তলীতে তাদেরকে নিয়ে আসেন টেকনাফের শাপলাপুর এলাকার জনৈক আব্দুল হামিদ নামে এক ব্যক্তি।
তিনি আরো বলেন, তাঁর কাছে কিছু টাকা ছিল। সেগুলো দিয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছেন তিনি। এখন টাকা পয়সা কিছুই নেই। গত বুধবার রাত থেকে তারা কিছুই খাননি বলে জানান।
জিয়ানগরের পাশে বৈদ্যঘোনা খাজা মঞ্চিল পাহাড়েও বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নিতে দেখা যায়।
সেখান থেকে পাহাড়তলী লাইট হাউজ সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তাায় দেখা মিলে একটি ছারপোকা গাড়ির। ওই গাড়িতে করে এসেছেন নতুন ২০ রোহিঙ্গা। তাঁরা উঠেছেন লাইটহাউজ ফাতেরঘোনা মৌলভী ওসমান গণি নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে। তিনিও আগে থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা।
রোহিঙ্গা বহনকারী ওই গাড়ির চালক মো. আরিফের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শাপলাপুর এলাকা থেকে ওসব রোহিঙ্গাদের বিজিবি সদস্যরা তাঁর গাড়িতে তুলে দেন। মৌলভী ওসমান গণির সাথে রোহিঙ্গা যাত্রীরা মোবাইলে যোগাযোগ করে। লাইটহাউজ পৌঁছে গাড়ি ভাড়া দেন মৌলভী ওসমান গণির স্ত্রী।
লাইটহাউজ ফাতের ঘোনা এলাকায় গত বুধবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত প্রায় ৭০ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। ফাতেরঘোনা এলাকায় আগে থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আত্মীয় স্বজনেরা বসবাস করছেন। বেশিরভাগই আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে উঠেছেন।
লাইটহাউজ ফাতের সমাজ কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, দুইদিন থেকে রোহিঙ্গা আসা শুরু করেছে। তারা এখানে আত্মীয় স্বজনের কাছে আশ্রয় নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ জনের মত রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে

About Jesmin Nahar

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*